সহীহ কোরআন শিখার সহজ পদ্ধতি

সহীহ কোরআন শিখার সহজ পদ্ধতি

রাসুল সা: বলেছেন, তোমাদের মাঝে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজে কোরআন শিখে এবং অন্যকে তা শিক্ষা দেয়। (সহীহ বুখারী)

অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, পবিত্র কোরআনের একটি হরফ (অক্ষর) তিলাওয়াতের জন্য দশটি নেকী পাওয়া যায়।

আমরা যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী তাদের প্রত্যেক এর জন্য কুরআন পড়া আবশ্যক। কিন্তু ছোটবেলায় যারা কোরআন পড়া শিখেছে পরবর্তীতে চর্চা না থাকার কারণে অনেকেই তা পড়তে পারে না। আবার এমন অনেকেই আছে যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয়েও নানা কারণে কোরআন শিখতে পারেনি।

কিন্তু প্রতিদিনের নামাজ আদায়ের জন্য কোরআনের বিভিন্ন সূরা জানা আবশ্যক। এছাড়া সঠিকভাবে ইসলামী জীবন ধারণের জন্য কোরআন পড়া ও অর্থজানা অবশ্যই কর্তব্য। তাই নিজের ও পরিবারের ছোট বড় সকলের জন্য কোরআন শেখার ব্যবস্থা থাকা উচিত।

বর্তমানে ইন্টারনেট এর যুগে চাইলে ঘরে বসেই কোরআন শেখা যায়। কোরআন শেখার বই, ইউটিউব এ কোরআন শেখার ভিডিও অথবা অনলাইনে কোরআন শেখার কোর্স এ ভর্তি হয়ে সহজে কোরআন শিখা যায়। আজকের আমরা সহীহ কোরআন শিখার সহজ পদ্ধতির পাশাপাশি নূরানী পদ্ধতিতে শিখা, আধুনিক পদ্ধতিতে কোরআন শিক্ষা এবং অনলাইন কোরআন শিক্ষা সম্পর্কে আলোচনা করবো।

 

সহীহ কোরআন শিখার সহজ পদ্ধতি

কোরআন শুধু পড়তে পারলেই হবে না তবে তা সহীহ (শুদ্ধ) হতে হবে। কেননা, ভুলভাবে কোরআন পড়লে সওয়াব এর পরিবর্তে গুনাহগার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন আমরা সহীহ কোরআন শিখার সহজ পদ্ধতি নিয়ে জানবো।

আমরা বাংলাভাষায় কথা বলি, কিন্তু কোরআন আরবি ভাষায় লেখা। যে কোন ভাষা পড়তে পারার জন্য সবার আগে সে ভাষার বর্ণমালাগুলো সঠিক উচ্চারণসহ জানতে হবে। তেমনি সহীহ কোরআন শেখার প্রথম শর্ত হচ্ছে আরবি বর্ণমালা চিনতে পারা ও উচ্চারণসহ বলতে জানা।

 

আরবি বর্ণ পরিচয়

আরবিতে সর্বমোট ২৯টি বর্ণমালা রয়েছে। তাই প্রথম কাজ হবে আরবি ভাষার সকল বর্ণ চিনতে পারা এবং উচ্চারণ করা। বাংলাভাষায় আমরা বামদিকে থেকে পড়া শুরু করি কিন্তু আরবি ভাষা বা কোরআন পাঠের সময় ডানদিক থেকে শুরু করতে হয়। আরবি বর্ণ ডানদিক থেকে বামে লিখা হয়ে থাকে।

যেমন: و ز ر ذ د ا

 

নোকতা সম্পর্কে জানুন

প্রথমদিকে অক্ষর চেনার পর আমাদেরকে সংযুক্ত অক্ষর চিনতে হবে। বাংলা বর্ণমালায় ছোট বা বড় অক্ষরের পার্থক্য তেমন না থাকলেও ইংরেজি বর্ণমালায় ছোট বড় অক্ষরের ধরণে ভিন্নতা রয়েছে।

যেমন: ب - بـ - ـبـ - ـب

আরবি বর্ণমালায় নোকতা তথা ফোটার মাধ্যমে অক্ষরের পার্থক্য হয়ে থাকে। তাই নোকতাযুক্ত ও নোকতাছাড়া বর্ণমালাগুলো আলাদাভাবে জেনে নিতে হবে। তেমনি শব্দ গঠনের সময় নোকতা দ্বারা অক্ষরগুলো চিনতে যাতে সমস্যা না হয় সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। যা সহজেই অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ব করা সম্ভব। যেমন:  ث--ج--خ--ش

 

আরবি বর্ণ উচ্চারণ শিখতে হবে

আপনি যদি অক্ষরের উচ্চারণ ও যুক্তঅক্ষরের পার্থক্য রপ্ত করতে পারেন তবে সহীহ কোরআন শিখার সহজ পদ্ধতি সম্পর্কে অর্ধেক জানা হয়ে যাবে। বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে আপনি সহজেই আরবি বর্ণ চেনা ও উচ্চারণগত বিষয়ে অবগত হতে পারেন। যেমন:  ـع ـعـ         عـ         ع

আরবি বর্ণমালা উচ্চারণের জন্য ১৭টি মাখরাজ তথা উচ্চারণের স্থান রয়েছে। বাংলাভাষায় যেমন বর্ণের উচ্চারণের জন্য আলাদা আলাদা স্থান রয়েছে। আরবি বর্ণ তার ব্যতিক্রম নয়। এ জন্য আপনাকে ১৭টি মাখরাজ (উচ্চারণের স্থান) সম্পর্কে জানতে হবে। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আপনি সহজে অক্ষরগুলো সহীহ মাখরাজসহ উচ্চারণ পদ্ধতি শিখতে পারবেন।

 

আরবি যুক্তাক্ষর সম্পর্কে জানতে হবে

আরবি বর্ণমালায় সংযুক্ত অক্ষর বা যুক্তাক্ষর শব্দ গঠনের সময় নতুন আকৃতিতে দেখা যায়। আগে থেকে যদি আপনি একই বর্ণের ভিন্ন আকৃতি সম্পর্কে ধারণা তথা চিনতে পারেন তাহলে সহজেই আপনি র্বণগুলো চিনতে পারবেন। এ পর্যায়ে এসে আপনি আরবী হরফের বিভিন্ন রূপ চিনতে ও পড়তে পারবেন। আরবি বর্ণের মিলিত রুপ পরিপূর্ণভাবে চেনা থাকলে আপনি সহজেই কোরআন পড়তে ও লিখতে পারবেন। যেমন: سُكُون  এখানে চারটি বর্ণ রয়েছে। তা হলো ن – و --  ك – س

 

আরবি বর্ণের উচ্চারণের ধরন

এখন আমরা আরবি বর্ণমালায় হরকত তথা উচ্চারণের ধরণ নিয়ে আলোচনা করবো। বাংলাভাষায় যেমন আকার, ইকার রয়েছে আরবি ভাষায় তা হরকত নামে পরিচিত। তা হলো যবর, যের এবং পেশ। এইসব হরকত বর্ণের উপর নিচে ব্যবহার করার মাধ্যমে উচ্চারণের ভিন্নতা তৈরি হয়ে থাকে।

এছাড়া যদি কোন হরকত অক্ষরের উপর দুইবার দেয়া হয় তাকে তানভীন বলা হয়ে থাকে।

তিনটি হরকত ছাড়াও আরবি বর্ণে আরেকটি হরকত দেয়া থাকে। যা জযম নামে পরিচিত। আরবি ভাষায় দুইটি বর্ণ যুক্ত হয়ে উচ্চারণ করার জন্য জযম ব্যবহার করা হয়।

 
তাশদীদ সম্পর্কে জানুন

উচ্চারণের সময় কোন অক্ষরকে দুইবার উচ্চারণের জন্য আলাদা হরকত ব্যবহার করা হয়। আরবি ভাষায় তা তাশদীদ নামে পরিচিত। আরবি ভাষার কোন বর্ণকে দুইবার তথা দ্বিত উচ্চারণের জন্য তাশদীদ চিহ্নের ব্যবহার করা হয়। কোনআর শেখার জন্য সহীহভাবে তাশদীদ যুক্ত শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারা জানতে হবে।

আরবি বর্ণমালায় দুটি বর্ণে তাশদীদ আসলে তা নাকের বাঁশি থেকে উচ্চারণ করতে হয়। যা গুন্নাহ নামে পরিচিত। বর্ণদুটি হলো م এবং ن । গুন্নাহসহ উচ্চারণ শিখতে হবে। কখন গুন্নাহ করে পড়তে হয় এবং কখন গুন্নাহ করতে হয় না তা জানতে হবে।

 

মাদ্দ সম্পর্কে জানতে হবে

কোরআন পড়ার সময় কিছু বর্ণ লম্বা বা টেনে পড়তে হয়। আরবি ভাষায় তা মাদ্দ বলা হয়ে থাকে। মাদ্দ-এর অক্ষর টেনে পড়তে হয়।

সহীহ কোরআন শেখার জন্য কোন কোন বর্ণ ও শব্দ মোটা এবং কোন কোন বর্ণ ও শব্দ চিকন করে পড়তে হয়।

কোরআন পড়ার জন্য যথা নিয়মে গোল তা এবং সিক্তা পড়ার নিয়ম জানতে হবে।

কোরআন পড়ার সময় বাক্যের শেষে অথবা মাঝখানে রিবতি দিতে হয়। আরবি এই বিরতি দেয়ার নিয়মকে ওয়াকফ বলা হয়। ওয়াকফের জন্য কতগুলো চিহ্ন রয়েছে। বাংলায় যেমন বিরাম চিহ্ন আরবিতে ওয়াকফ নামে পরিচিত। সহীহ কোরআন শিখার জন্য ওয়াকফের নিয়মগুলো জেনে নিতে হবে।

 

নূরানী পদ্ধতিতে শিখা

পূর্বে কোরআনের কয়েকটি সূরা মুখস্ত করার নিয়ম চালু ছিল। যা শুধুমাত্র নামাজ ও বিভিন্ন দোয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছিল। কোরআন শিখার উপায় হিসেবে বর্তমানে নূরানী পদ্ধতিতে কোরআন শিখা খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সহজ ও কম সময়ে নূরানী পদ্ধতিতে কোরআন শেখা যায়।

আমাদের দেশে প্রচলিত কোরআন শেখার পরেও অনেকে সহীহভাবে কোরআন পড়তে পারে না। কেউ যদি আরবি ভাষা পড়তে পারে অবশ্যই কোরআন পড়তে পারবে। সাধারণ ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়ে থাকে। কিন্তু শুধুমাত্র কোরআন শেখার জন্য আলাদা করে আরবি ভাষা শেখার প্রয়োজন নেই।

নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করেই কোরআন সহজে শেখা যায়। বাংলাভাষাীদের জন্য খুব সহজে কোরআন শেখার জন্য নূরানী পদ্ধতি রয়েছে। তাই বর্তমানে খুব সহজেই কোরআন নূরানী পদ্ধতিতে শিখা যায়। এ জন্য নূরানী পদ্ধতিতে কোরআন শিক্ষা নামে বই রয়েছে। পাশাপাশি এই বইয়ের অনলাইন ভার্সন পিডিএফ হিসেবে পাওয়া যায়। নূরানী পদ্ধতি কুরআন শিক্ষার সহজ পদ্ধতি হিসেবে সাফল্য লাভ করেছে।

 

আধুনিক পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষা

আধুনিক পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষা করা যায়। এ পদ্ধতিতে স্বল্প সময়ে যে কেউ কুরআন শিখতে পারে। গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে খুব কম সময়ে ও সহজে কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। ছোট বড় সকলে আধুনিক পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

 

অনলাইন কোরআন শিক্ষা কোর্স

 বর্তমান যুগ ইন্টারনেট তথা অনলাইনের যুগ। আগে আমরা কোন কিছু শেখার জন্য নির্দিষ্ট কোন প্রতিষ্ঠানে যেতে হতো। অথবা ঘরে শিক্ষক এর মাধ্যমে পাঠ নিতে হতো। কিন্তু বর্তমানে ইন্টারনেট এর ফলে আমরা সহজেই ঘরে বসে অনলাইন কোরআন শিক্ষা কোর্স এর মাধ্যমে কোরআন শিখতে পারছি।

সহজে কোরআন শেখার জন্য নানা প্রতিষ্ঠান অনলাইন কোরআন শিক্ষা কোর্স চালু করেছে। অনলাইন কোরআন শিক্ষা কোর্স এ ভর্তি হয়ে ঘরে বসেই আমরা কোরআন শিক্ষা করতে পারছি। যারা কোরআন শিখতে আগ্রহী তারা অনলাইন কোরআন শিক্ষা কোর্সের মাধ্যমে সহজেই কোরআন শিখে নিতে পারেন।

 

উপসংহার

আমাদের সকলকে কোরআন শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে হবে। কোরআন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যাবশ্যক। নানা কারণে কোরআন শিক্ষা না করলেও আধুনিক পদ্ধতিতে খুব সহজেই কোরআন শিক্ষা করা যায়। তাই যথাসম্ভব দ্রুত কুরআন শিক্ষা কোর্স এর মাধ্যমে আপনি ও আপনার পরিবারের সকলে কোরআন শিখে নিতে পারেন।

Related Post

No data found